ইচ্ছে মতো হয়না সবকিছু..
জীবনে চাকরি বাকরি করার ইচ্ছেও কখনো ছিল না। নিজের ভালোলাগার ভালোবাসার কাজকর্ম করব। সেটাই হবে জীবিকা। চিন্তা ভাবনা ছিল এমন। কিন্তু ওই যে, একটা সময়ের পর থেকে আমার না ভালোবাসা বিষয়গুলোকেই ভালোবাসায় পরিণত করতে হয়েছে, ভালোবাসতে হয়েছে! সে তালিকা দীর্ঘ.. তবুও কিছুটা। বহু প্রতিকূল পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করে মাধ্যমিক পরীক্ষায় সফলতার সাথে প্রথম বিভাগে (একটুর জন্য স্টার মার্কস হয়নি। প্রসঙ্গত ছাত্রজীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা আমি সবার সাথেই পরীক্ষায় বসতে চেয়েছিলাম। বসেছিলাম। না কোন সিক বেড। না কোন বিশেষ সুবিধা নেওয়া। বিশেষ কোন সার্টিফিকেটের সুবিধা আমি ইচ্ছে করেই নেইনি। পরীক্ষার ফলাফলে আনন্দে চোখে জল এসেছিল। নিজেকে নিজে বিশ্বাস করতে পারিনি..) উত্তীর্ণ হওয়া পর ভাবলাম বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করব। হয়নি। পরিস্থিতি সময় সাথ দেয়নি। অগত্যা কলা বিভাগে পড়াশোনা করলাম। তবে অবশ্যই সাথে একটা পছন্দের বিষয় রাখলাম "কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন"। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভাবলাম গ্ৰাজুয়েশন করব কম্পিউটার নিয়ে (BCA বা এমন ধরনের কিছু) সেটাও হয়নি। যোগাযোগ, সময়, পরিস্থিতি সাথে দেয় নি। তবে মনে ভেবেছিলাম যদি গ্ৰাজুয়েশন করতেই হয় তবে অবশ্যই যে কোন বিষয়ে অনার্স নিয়ে পড়াশোনা করব। কী হবে জানা নেই। কোনদিকে যাবো জানা নেই। জানা বা ভাবার মতো পরিস্থিতি বা ইচ্ছেও নেই। কিন্তু তাও..
ইতিহাস অনার্স নিয়ে এলাকার নিকটবর্তী কলেজে ( কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনস্ত) গ্ৰ্যাজুয়েশনে ভর্তি হলাম। পড়াশোনা করতে লাগলাম। আবার বাধা। বিস্তারিত লিখলাম না আর। মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়লাম। ভাবলাম, কী করব আমি?
ঠিক আছে। একটু সময় নিয়ে ভাবা যাক। কমিউটার তো বাড়িতে আছেই। ভাবলাম গ্ৰাপিক, ওয়েব ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শিখব। কিন্তু সে শিখতে গেলে তো শহরে যেতে হবে। যেটা আমার জন্য বেশ অসুবিধার। নিজেই শুরু করলাম শেখা অনলাইনে। তার সাথে কিছুদিন পর নেতাজী মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। বিষয় সেই একই। ইতিহাস অনার্স। চলতে থাকল পড়াশোনা। সাথে কম্পিউটার নিয়ে আরো একটু বেশি সময় দেওয়া। ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট সেম সমাপ্ত করে দ্বিতীয় সেমে প্রবেশ করলাম। ততদিনে ফ্রীল্যান্সিং এ অনলাইনে নিজের মোটামুটি বেশ ভালো একটা জায়গা করে নিয়েছি। কিন্তু ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। সারাদিন সারারাত দিনের পর দিন জেগে কাজ করে আসলেই শরীরে ধকল নিচ্ছিল না। মা বললো "বাবু, তুই শিক্ষকতার চাকরির পরীক্ষায় বস। না পেলে না পাবি। আর পেলে যদি মন চায় চাকরি করবি। একটা অন্যরকম জগত পাবি। বাইরে যাবি, কাজ করবি। ভালো লাগবে।" মন চাইল আবার চাইল না। তবে মা বলেছে, তাই দেখাই যাক। অনেক ভাবলাম, পরীক্ষা দিলাম। পাশ করলাম..
আমার পাশের গ্ৰামে একটি সরকারি অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০১৭ তে শিক্ষকতার কর্মজীবনে প্রবেশ। যোগদান সহজ ছিল না। সেখানেও বাধা। সেও এক ইতিহাস.. মিডিয়া ছেয়ে গেল সেই খবরে। হুইলচেয়ারে মাস্টার? অনেক ধৈর্য্য, দিনের পর দিন প্ররিশ্রম করে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিতে সময় লেগেছে নতুন কর্মক্ষেত্রে। চাকরির পাশাপাশি চেষ্টা করলাম ফ্রীল্যান্সিং টা চালিয়ে যাওয়ার। পারলাম না। শরীর ধকল সহ্য করতে পারল না। যদিও কিছু কিছু কাজ করতে থাকলাম। তবে খুবই কম। ২০১৯ এর মাঝামাঝি সময় পর্যন্তও কিছু কিছু কাজ চালিয়ে গেছি। কিন্তু খুব কষ্ট হচ্ছিল। পারছিলাম না। মা বললো, "বাবু, চাকরি কর। চাকরির দিকেই নজর দে। বাকী সময়টা নিজেকে দে। এবার একটু নিজেকে সময় দে। নিজেকে খুশি রাখতে চেষ্টা কর।"
তখনও বুঝলাম না মা হঠাৎ কেন আমায় খুশি থাকার কথা বলছে। ২০২০'র মার্চ মাসের পর থেকে সবকিছু কেমন যেন বদলে গেল ধীরে ধীরে। একের পর এক স্বজন হারা হলাম। দাদুভাই, মাসি দিদা, টিংকু কাকু..
দেখলাম, কঠিন বাস্তবতা চোখে চোখ রেখে মুখোমুখি হতে শুরু করেছে। ভাবলাম, সময় খুব কম। চাকরি করি আর নিজেকে সময় দেই। নিজেকে সময় দেওয়া মানে নিজে আগামীতে কীভাবে বাঁচব সেটার সমাধান খুঁজে বার করতে হবে আমায়। কাজটা মোটেই সহজ নয়..
বুঝলাম, জীবনে সবসময় সবকিছু ইচ্ছে মতো কখনোই হয় না। তবে স্বপ্ন দেখতে হয়। চেষ্টা করতে হয়।
Comments
Post a Comment