দূরভাষ, মুঠোফোন এবং আমি

 


।। দূরভাষ, মুঠোফোন এবং আমি ।।

                                             (দুবছর আগের লেখা)

সময়টা সম্ভবত ১৯৯৮ - ২০০১ সালের এর মধ্যে। আমি তখন ওই ৯ থেকে ১০ বছর হবো। আমার মামারবাড়ী (লক্ষ্মীকান্তপুর) থেকে আমার মামুর সাথে গিয়েছিলাম আমার জয়গরের দেশ বাড়ীতে। পরিকল্পনা ছিল সারাদিন ঘুরে টুরে আবার মামার বাড়ীতে ফেরার। কিন্তু ট্রেন বন্ধ বা কোনো এক সমস্যার কারণে আমাদেরকে জয়নগরে থেকে যেতে হয়েছিল। তাই এই খবরটা মামারবাড়ীতে পৌঁছে দিতে, জয়নগর স্টেশনের কোনো এক মিস্টির দোকান থেকে মামুর সাথে আমি গিয়ে টেলিফোনের মাধ্যমে খবরটি পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম এই প্রক্রিয়াটির পর। এই ছিলো দূরভাষের সাথে আমার প্রথম পরিচয়।

তার কিছু বছর পর আমাদের বাড়ীতে ল্যান্ডলাইনের টেলিফোন এলো। অনেক মজা, অনেক আনন্দ। ফোন আসলেই আগে দৌড়ে গিয়ে ফোনটিকে রিসিভ করতে যাওয়া। F.M. - এ ফোনে লাইন পাওয়ার চেষ্টা সহ নানান কিছুর মধ্যে দিয়ে কেটেছে এই সময়টি। এ ছিলো এক অনাবিল আনন্দের সময়। যা বলে হয়ত প্রকাশ করতে অপারগ আমি।

পরবর্তিতে (আমি Juvenile Rheumatoid Arthritis - এ আক্রান্ত হ‌ওয়ার পরে) কোলকাতায় ডাক্তারবাবুর জামার পকেটে একটি ছোট মত ফোন দেখেছিলাম। তখন জানতামনা যে ওটি মোবাইল ফোন। শুধু শুনেছিলাম যে ওই জিনিসটা যেখানেই নিয়ে যাওয়া হবে, সেখান থেকেই ফোন করা যাবে। শুনেছিলাম এটির অনেক দাম, এটি শুধুমাত্র ডাক্তারবাবু সহ বিশিষ্ট মানুষদের কাছেই থাকে। বেশ অবাক হয়েছিলাম। অনেক কৌতুহল হয়েছিল। প্রত্যক্ষভাবে মোবাইল ফোন ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য না হলেও, এটা ছিল মোবাইল ফোনের সাথে আমার প্রথম পরিচয়।

তার পরে আস্তে আস্তে মোবাইল ফোন নামক বস্তুটি আমাদের এলাকাতে সচল হতে শুরু করে। আমার বাপি নিজে একটি মোবাইল ফোন কিনেছিল। যেটা দিয়ে আমি মাঝে মধ্যেই গেম খেলতাম। এই সময়টাই ছিল মোবাইল ফোনের সাথে আমার প্রথম প্রত্যক্ষভাবে স্পর্শ সহ পরিচয়ের সময়।

আমি প্রথম আমার নিজের মুঠোফোন হাতে পেয়েছিলাম যখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। বাপি এই মুঠোফোনটি আমাকে কিনে দিয়েছিল। কি ভাবছেন? এতো অল্প বয়সে মুঠোফোন আমার হাতে কেন? এর পিছনেও রয়েছে এক দীর্ঘ কাহিনী। একটু সংক্ষেপে‌ই বলি। আসলে, হঠাৎ শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমাকে এক বছর (2002 সালে ষষ্ঠ শ্রেণীতে) ক্লাসে রয়ে যেতে হয়েছিল। জীবনে বেঁচে থাকার আশা ছিল ক্ষীণ। চলছিল বেঁচে থাকার সংগ্ৰাম (এই সংগ্ৰাম এখনও চলছে)। চিকিৎসা চলছে এবং তার সাথে বিনোদন। এই বিনোদনের একটি টুল‌ই ছিল আমার মুঠোফোনটি। বাপি আমাকে এটা নিজেই কিনে দিয়েছিল। প্রসঙ্গত এই মোবাইলের মডেলটি ছিল নোকিয়ার 3100, কালার ফিচার হ্যান্ডসেট।

আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি, তখন আমার নূতন সঙ্গী হয়েছিল Nokia 5300 Express Music। ইতিহাসের নোটস মুখস্থ করতে এই বন্ধুটি ছিল আমার খুবই সহায়ক। শরীরে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে আমি একটানা ব‌ইয়ের দিকে তাকিয়ে পড়তে পারতামনা। তাই কষ্ট করে কোন একটা টপিক একবার পড়ে নিতাম এবং মুঠোফোনটি দিয়ে ভয়েস রেকর্ড করে নিতাম। পরে সেটাকেই বারবার শুনতাম। তাছাড়া "মা" পড়লেও শুনতাম। যাইহোক, আমার মুঠোফোন হিসেবে Nokia 5300 Express Music ছিল আমার দ্বিতীয় মুঠোফোন।

এরপর 5300 Express Music নিয়ে কেটেছে অনেকগুলো বছর (সে আমার কাছে এখনও সযত্নে আছে, তবে খুবই দুর্বল ও ক্লান্ত)। প্রায় ২০১২ সাল পর্যন্ত সে ছিল আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী। ২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আমি নিজে কোনো মোবাইল ফোন নিইনি। বাপি কিনে‌ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি নিইনি। না না কোনো রাগ বা অভিমান করে নয়। ইচ্ছে ছিলো নিজে যেদিন

কিছু রোজগার করবো সেদিন একটা স্মার্টফোন কিনবো। ২০১৫ সালে হঠাৎ আমি ফ্রীল্যান্সিংয়ে ভালো উন্নতি করে ফেলি। কাজের প্রয়োজনে প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করি একটি স্মার্টফোনের। কিনে ফেলি একদমই বেসিক লেভেলের একটি স্মার্টফোন "Moto E3 Power" Flipkart থেকে। এটাই ছিল আমার প্রথম স্মার্টফোন।

তারপর চাকরি পাই ২০১৭ সালে। এই ২০১৮ তে স্মার্টফোনের আমুল পরিবর্তন হয়েছে। খুব ইচ্ছে হল একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্মার্টফোন কেনার। এই সময়ে দরকারেও লাগবে। বাপি এবং মাদারকে বললাম বিষয়টা। ব্যাস, হাতে পেয়ে গেলাম আমার সেই স্বপ্নের স্মার্টফোন Asus Zenfone Max Pro M1 ( Black, 64 GB, 6 GB Ram)। না না আমার রোজগারের টাকা দিয়ে নয়। বাপি এবং মাদার মিলে এটি আমায় কিনে দেয়েছে।

বিজ্ঞান যেমন আশীর্বাদ, তেমন‌ই অভিশাপ। মুঠোফোন আমার জীবনে(পরিবেশ, পরিস্থিতি, সময়ের ভিন্নতার কারণে হয়ত এটা শুধুমাত্র আমার জীবনের জন্য‌ই প্রযোজ্য) আশীর্বাদ, বন্ধুসম। পড়াশুনার মাঝেও এটিকে আমি সঠিককাজে ব্যবহার করেছি। অকাজে কোনদিন নয়। মুঠোফোন বা আমার কম্পিউটারে কোনদিন কোনো গেম ইনস্টল করা হয়েছে কিনা ঠিক মনে পড়েনা। আমার মনে হয় প্রযুক্তির ব্যবহার দরকার। তবে তাকে বিপথে চালনা না করে খুব সতর্কতার সাথে সঠিক পথে ব্যবহার করলে বোধ‌হয় কিছু ক্ষতি নেই। চলুক প্রযুক্তির ব্যবহার। সঠিক পথে, সঠিক ভাবে। চলুন বিজ্ঞানকে কাজে লাগাই আশীর্বাদ রুপেই, অভিশাপ রুপে নয়।

*** Thank You My Mom and Dad. Love You***

©️ অর্ণব কুমার হালদার

22/09/2018, শনিবার

Comments

Popular posts from this blog

আমার_নীরব_সঙ্গীর (◼️ KM - 5000 ) - এর সাথে চার বছর, চার বছুরে উদ‌্‌যাপন,

ভুলে যাস না, ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল এই অর্ণব...

আবিস্কার