আমার জীবনের এক বন্ধুত্বের গল্প / অপু
প্রথম ট্যাগ,
ফেসবুকে তোকে আবার খুঁজে পাওয়া ( ২০১১ )...
~ আমার জীবনের এক বন্ধুত্বের গল্প ~
খোলা চিঠি,
অপু ,
না, আজকে তোর ( DrMourjya Bera ) জন্মদিন নয় হয়তো। তবে ফেসবুকের একটা ছবি মেমরি হয়ে ফিরে আসা। ওই ছবিতে আমাকে ট্যাগ ( ফেসবুকের তথ্য অনুযায়ী এটাই ফেসবুকে আমাকে করা তোর/কারোর প্রথম ট্যাগ)। অনেক কথা মনে করিয়ে দিল রে। অনেক....
তোকে নিয়ে আর কত লিখব বল। তোকে নিয়ে তো আমার হাজার স্মৃতি রে। তোর সাথে আমার প্রথম পরিচয় সেতো একটা আস্ত গল্প 😀।
২০০১ সালে ভেলোরের CMC তে তোর সাথে প্রথম আলাপ। দু'জনেই হসপিটালে ভর্তি। দু'জনের জন্ম সাল একই। ১৯৮৯। তুই ২৭ নভেম্বর। আমি ১২ ডিসম্বর। তুই ১৫ দিনের বয়সে বড় আমার থেকে। - আমি প্রথম বলেছিলাম দাদা ডাকি তোকে?
-- তুই বললি দুস্। একই সালতো দুজন। মাত্র ১৫ দিন। এক করে নে 😀।
বন্ধুত্ব 🤝।
তুইতো আমার বেডেই সারাক্ষণ। গল্প, আড্ডা, ওয়াকম্যানে গান শোনা, লুডো খেলা। একই পাত্রে চপ মুড়িও খেয়েছি দুজন হসপিটালের বেডে বসেই।
নিশ্চয়ই মনে পড়ে অপু?
পুরো ইউনিট জানত আমাদের কথা। এমনকি ডক্টর রাউন্ডের সময়েও থোড়াই কেয়ার। তুই আমার বেডে। ডক্টররা আর কিছু বলতেন না আমাদের কান্ডকারখানায়। শুধুই হাসতেন, প্রশ্রয় আর ভালোবাসা দিতেন। আমি তো হেঁটে গোটা ইউনিট ঘুরতে পারতাম না। তুই তোর বর্ম পরে ( চলাফেরার জন্য এক বিশেষ ব্যবস্থা। ওটা পরলেই অপুর চলাফেরা করতে সুবিধা হতো ) অসীম ধৈর্য্য ধরে গোটা ইউনিটের সবার খবর রাখতিস। আমাকে এসে প্রতিনিয়ত জানাতিস।
আমরা কত্ত আলোচনা করতাম, এটা কি হবে ওটা কি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। দুই বিশেষজ্ঞ কিনা। আমার থেকে তুই আরও 😀😀😀😀😀।
তোর সাথে আমার কথোপকথনের কয়েকলাইন -
Tan : অপু বড় হয়ে কি হতে চাস?
Apu : ছেলেবেলায় রচনায় লেখা যা, ডাক্তার। তবে ওটা আমার মন থেকে।
Apu : তুই কি হতে চাস?
Tan : সঙ্গীত শিল্পী অথবা ডাক্তার। তবে এইমুহুর্তে ইচ্ছেগুলোর প্রতি আস্থা হারাচ্ছি। সময় বড়োই লুকোচুরি খেলছে রে আমার সাথে। দেখা যাক...
জেঠু ( তোর বাবা ) প্রায়ই বলতেন, "কেন যে শুধু শুধু দুটো বেড ভাড়া দিচ্ছি আমরা, সেটাই ভাবি মাঝে মধ্যে 😀। মৌর্য আর তান একই বেডেই থাক। দুই পাগল 😀 "।
তারপর তোর বাড়ির ল্যান্ডফোনের যোগাযোগ নম্বর নেওয়া। তখন তো মোবাইল ফোনের এতো প্রসার ঘটেনি। তুই ফিরে আসলি বাড়ি। কেন ফিরলি সে বিস্তারিততে এখানে আর গেলাম না। আমিতো জানি! আমি রয়ে গেলাম ওখানে চিকিৎসার জন্য।
হসপিটালে চিকিৎসা, অপারেশন করে প্রায় এক মাস ভর্তি ছিলাম।আমিও বাড়িতে ফিরলাম।
আমার বাড়ির ল্যান্ডফোন থেকে তোর বাড়ির ল্যান্ডফোনে যোগাযোগ করা। কথাবলা। এর মাঝে হঠাৎ করে তোর ল্যান্ডফোনের নম্বর হারিয়ে ফেলি। অনেক মাস কাটে। মনে আছে, একদিন নম্বর আন্দাজ করে করে ১০ টা ল্যান্ডফোনে কল করে কথা বলে তোর সাথে যোগাযোগ করতে সফল হয়েছিলাম। পরে শুনেছিলাম, তুইও আমার ল্যান্ডফোনের নম্বর হারিয়ে ফেলেছিলিস। জেঠু ( তোর বাবা ) নাকি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আমার সম্পর্কে সংবাদ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে আমাকে খোঁজ করার 😀😀!
যাইহোক, এরপর আমার চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষ প্রয়োজনে দাঁতনে তোর বাড়িতে যাওয়া সপরিবারে। সালটা ঠিক মনে নেই। বোন ( অঙ্কিতা ) তখন খুব ছোট। ওর জন্ম ২০০২ সালে। আবার তোর সাথে আমার দেখা। কথা, আড্ডা। দাদা, দিদি, জেঠু, জেঠিমা। বাকিটা আর বললাম না 😀
বাড়িতে ফেরা। পড়াশোনায় মনোনিবেশ করা যে যার মতো। নিজেদের কাজ। এর মাঝে তোর বাড়ির ল্যান্ডফোনের নম্বর সম্ভবত কাট করা হয়। সে আমারও। আসলে ততদিনে মোবাইল, ইন্টারনেট মোটামুটিভাবে পেয়ে গিয়েছি আমরা।
২০১১ সাল। অনেক বাঁধা অতিক্রম করে অবশেষে আমার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া, প্রথম বিভাগে পাশও করে যাওয়া ।
https://www.facebook.com/arnabkumarhalder/posts/1945551022210904
(এরপরের ঘটনা অন্য কোন একদিন লিখব। অপুর কথাতেই আসি আপাতত।)
তোর কথা ভীষণভাবে মনে হওয়া। কি করি, কি করি ভেবে না পেয়ে ---
ফেসবুকে তোকে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে শুরু করলাম। মনে আছে, তোর আসল নামের বানানটাই ঠিক মতো তো না জানতাম রে। আমি তো আমার অপুকেই জানি শুধু। অনেক চেষ্টার পরে একজনের প্রোফাইল খুঁজে পেলাম। বিস্তারিত দেখলাম,সব মিলে গেল। কিন্তু, lives in Moscow, Russia এটা মেলাতে পারলাম না। ইনবক্স দিলাম তোকে। এই সেই অপু? উত্তর এককথায় হ্যাঁ ! তান!!
বললি, ডাক্তারি পড়তে গেছিস। আনন্দে আমার চোখে জল। অপু ডাক্তারি পড়ছে, অপু ডাক্তারি পড়ছে, জোরে জোরে চিৎকার করে সবাইকে বলতে থাকলাম!
আমি আবার খুঁজে পেলাম তোকে। এটাই ভালোবাসা।আত্মার মিল! তারপর তো বহুদিন হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর টাই নিইনি। বছরের পর বছর ফেসবুক দিয়েই যোগাযোগ, ম্যাসেঞ্জারে ভয়েস, ভিডিও কল।
ওখানে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরলি।কর্মক্ষেত্র। হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর এবার নিলাম।
আমার চিকিৎসা সংক্রান্ত নানা বিষয়ে তোর সাথে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আলোচনা হয়েছে।
আমার শারীরিক অবস্থার যখনই অবনতি হয়েছে, তোর কাকিমার ( আমার মায়ের ) সাথে তুই কথা বলে গাইড করেছিস। ভয় নিয়ে কোন প্রসঙ্গ কখনও আসলেই মা তোর কথা আমাকে বলেই বলে, "অপুর কথা মনে কর। অপুকে দেখেছিস?"
তোকে আর হারাতে চাই না অপু। আর, যদি আবার যোগাযোগের মাধ্যম হারিরেও ফেলি, তান ঠিক খুঁজে নেবে তোকে। খুঁজে নেবেই। যদিও তিন তিনবার এমন ঘটনা ঘটে গিয়েছে। তাই আর এটা হবে না বলেই মনে হয়। এখন তুই মস্ত বড় ডাক্তার।আর আমি 😀 ? সঙ্গীত শিল্পী বা ডাক্তার নই। শিক্ষক ! বলেছিলাম না, সময় বড়োই লুকোচুরি খেলছে রে আমার সাথে। দেখা যাক...
জানি তুই খুব খুশি। একথা বহুবার জানিয়েছিস আমায়। এখনও বলি, দেখা যাক...
এই কঠিন সময়ে নিজের জীবন বাজি রেখে প্রতিনিয়ত লড়ে চলেছিস মানুষের জন্য, মানুষকে বাঁচাতে। তুইতো সেবক। এটাই তো অপু! তোর মধ্যে দিয়েও আমার অনেক স্বপ্ন সার্থক অপু। একথা তোকে আমি আগেও বলেছি। তোর প্রচন্ড ব্যস্ততার জন্য ইচ্ছে করেই এই সময়টা তোকে হোয়াটসঅ্যাপ করি না। তবে হোয়াটসঅ্যাপ করলেও তুই হাজার কাজের মাঝেও রিপ্লাই দিস এই তানকে! দিবি নাই বা কেন? তানের জন্য তোর তো একটা দায়িত্ব আছে।আছে অধিকার!
তুই আমাকে জীবনযুদ্ধে "রিয়েল হিরো" বলিস বারেবারে! ভরসা দিস। দিস সাহস। একটা লুক্কায়িত শক্তির প্রতি আজীবন বিশ্বাস রেখে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে চলাটা, তোর কাছ থেকে তো শিখেছি অপু!
ভালো থাকিস। সবাইকে ভালো রাখার দায়িত্ব তুই নিজে হাতে তুলে নিয়েছিস, ভালো রাখিস সবার। ভালোবাসায় আছিস। ভালোবাসায় রয়ে যাবি সারাটা জীবনজুড়ে !
ছবি - ফেসবুকে আমাকে ট্যাগ করা তোর প্রথম ছবি। মস্কো, রাশিয়া ১৩ জুন ২০১১। তবে আমাকে ট্যাগ করেছিলিস আজকের দিনেই ২৮ জুলাই ২০১১ ।
মুল পোস্ট - এখানে
- তান
২৮ জুলাই ২০২০ মঙ্গলবার।
Comments
Post a Comment